Bengali Poems

Read Bengali poems & short stories by Rina Ghosh. Please feel free to comment on the posts.

আহ্বান



জীবন,
তুমি মদির মোহক গন্ধ নিয়ে
মোর চেতনায় এসো
        স্পর্শ কোরো মন –
আমি কস্তুরী হয়ে যাবো ।
বাস্তব,
তুমি সবুজ ঘাসের মুক্তাঙ্গনে
নগ্ন পায়ে হেঁটো
      নূপুর পায়ের পরশ –
আমি শিশির হয়ে যাবো
স্বপ্ন,
তুমি সুমেরুর শ্বেত প্রান্তরে
হিমধারা হয়ে নেমো
       সফেন তুলোর স্নান –
আমি তুষার হয়ে যাবো ।
যন্ত্রণা ,
তুমি অচেতনার দ্বার দিয়ে
চৈত্রের হাওয়া হয়ে এসো
        উড়িয়ে দিও মন –
আমি পলাশ হয়ে যাবো ।
সুখ,
তুমি নীরব রাতের কুহকতায়
চন্দ্রিমা হয়ে ভেসো
       রুপোলী আলোর জোয়ার –
আমি পূর্ণিমা হয়ে যাবো ।
কামনা,
তুমি ঝিনুক প্রবাল মুকুট পরে
ঢেউয়ের সঙ্গে  নেচো
       ফেণায় ফেণায় মিশে –
আমি সাগর হয়ে যাবো ।
কান্না,
তুমি কৃষ্ণঘন মেঘের থেকে
বৃষ্টি হয়ে ঝোরো
       বারিধারার স্রোতে –
আমি নদী হয়ে যাবো ।
তৃষ্ণা ,
তুমি রঙ্গিন পাখা মেলে দিয়ে
বলাকার  মত ভেসো
       সূর্য তোরণ দিয়ে –
আমি আকাশ হয়ে যাবো ।
আর প্রেম,
তুমি কুবেরের ঐশ্বর্য নিয়ে
আমার দ্বারে এসো
        উজাড় কোরো ঝুলি –
আমি ফকির হয়ে যাবো ।

ছোট হতে চাই


বড় হবার মজা অনেক
         ছোটবেলায় ভেবেছি ,
দূর কলেজে পড়তে যাবো
       এই রোমাঞ্চে কেঁপেছি ।
‘এটা কোরোনা’ , ‘ওটা করো’
        বাবা তো আর বলবে না ,
‘কাঁচকলাটা’ খাস নি কেন’
        মা ঘ্যানঘ্যান করবে না ।
বড় যখন হয়ে গেলাম
         দূরে পড়তে এসেছি
খুঁজছি এখন মজা কোথায়
         সব হারিয়ে ফেলেছি ।
আজ খেতে চাই সে কাঁচকলা
        মায়ের হাতের রান্না  ,
সুখদুঃখে ভাই কাছে নেই
        পায় যে শুধু কান্না ।
বাবার সে ডাক ‘ও মামনি’
        কানের কাছে শুনতে পাই,
ও ভগবান , এখন আমি
         আবার ছোট হতে চাই ।

অপেক্ষা


আমার  সকল  নিয়ে  বসে  আছে
       সে  যে  আমার  প্রাণের  সই,
তাঁর  প্রেমেরই  মহুয়াফুলের
      বেহুঁশ  নেশায়  মাতাল  হই ।
তাঁর  চাওয়াতেই  কৃষ্ণচূড়া
      রাঙ্গিয়ে  দিল  অবুঝ  মন,
তাঁরই  আশায়  পায়ের  নুপুর
      উঠলো  বেজে  ছনন  ছন ।
তাঁর  হাওয়াতেই  দোলে
      হৃদয়  বৃন্তে  ফোটা  লাল  কুসুম,
তাঁর  ছোঁয়াতেই  জাগল  রবি
     ভেঙ্গে  রাতের  নিঝুম  ঘুম ।
তাঁর  তালেতেই  মেলে পাখা
     নাচল  উদাম  বন –ময়ূর,
তাঁর  ইশারায়  গাইল  পাখী
     নাম-না-জানা  অচিন  সুর  ।
আসবে  কখন  সেই  প্রিয়  সই
      আমার  মনের জানলাতে,
অপেক্ষাতে  দিন  কেটে  যায়
      ঘুম  আসেনা  রোজ  রাতে । 

আজও সুপ্রিয় !



আজও তোমাকে স্বপ্নে দেখি সুপ্রিয় !
আজও তোমায় ভেবে আমার চেতনা হয় এলোমেলো ।
রৌদ্রবিধুর নিস্তব্ধ দুপুরের সেই অস্থির প্রণয়ের ছবিগুলি
আজও আমায় বিবশ করে দেয় ।
বৃষ্টি ধোয়া তরল সন্ধ্যায়
আজও তেমনি করে শিহরিত হয় শরীর
সেই একই ছাতার তলায় ভেজার রোমাঞ্চে ।
আজও আমার শরীরী-সঙ্গীতে
তোমার দেওয়া সুর কল্লোলিত নদীর প্রবাহ হয়ে বয়ে যায় ।
আন্দোলিত বসন্তের হাওয়ায় তোমার বনজ ঘ্রাণ
আজও আমার সুতীক্ষ্ণ নিভৃতিকে করে দেয় ছিন্নভিন্ন ।
গভীর সৌহার্দের সেই রাজকীয় মুহূর্তগুলো
আজও আমার কল্পনদের ঝর্নাতলায় স্নানরতা ।
আজও আমার নিঃশ্বাসে তোমার উষ্ণ ঘনস্পর্শ ।
আজও আমার হৃদয় উপবনে দোলা দিয়ে যায়
তোমার চিত্রিত সুখের পত্রমঞ্জুরী ।
আমার শৃঙ্খলিত বিষণ্ণ হৃৎপিণ্ডে তোমার শূন্যতায়
আজও হয়ে চলেছে শব্দহীন রক্তপাত ।
আজও এই দিনান্তের আচ্ছন্নতায় আমার উন্মনা মন
সেই নীল উত্তাল প্রেমের ঐশ্বর্য  খোঁজে  ।
তাই আজও তোমাকে স্বপ্নে দেখি সুপ্রিয় !

আমি সত্যি বলছি


রেললাইনের জলার ধারে ঝুপড়ি ঘরে বাস
চোখের জলে তেষ্টা মেটাই অভাব বারমাস ।
বাপ মাঠের ভাগের চাষি মা কাগজ কুড়োয়
পান্তা আনার যোগাড়েতে ঘরের নুনও ফুরোয় ।
সবে ষোল ফ্রক ছেড়ে শাড়ী ধরেছি
জীবনটা কি এইবয়সেই বুঝে গিয়েছি ।
“সত্যি বলছি আমি সত্যি বলছি”  ।।

শীর্ণ কলেবর ঢাকি দিয়ে জীর্ণ শাড়ি
শুকনো মুখে রোজ দুবেলা যাই বাবুদের বাড়ী  ।
গিন্নিমাদের চ্যাটাং কথা, বাবুর লোভী হাত
গায়ে কিছুই লাগেনা আর, এসব জলভাত ।
হেজা হাতে এঁটো বাসন মেজে চলেছি
সেই হাতেতেই মেহেন্দী আঁকার স্বপ্ন দেখেছি ।  
“সত্যি বলছি আমি সত্যি বলছি” ।।

বাবুর বাড়ীর মেয়ের মত আমার হবে বিয়ে
আমিও শ্বশুরবাড়ি যাবো ঘোমটা মাথায় দিয়ে ।
বরের সাথে ঘুরতে যাবো চড়ে দামী গাড়ী
করতে হবেনা ঝি-গিরি লোকের বাড়ী বাড়ী ।
স্বপ্ন দেখায় পেটের খিদে ভুলে গিয়েছি
খালি পেটে কল্পনার জাল বুনে চলেছি ।
“সত্যি বলছি আমি সত্যি বলছি” ।।

রঙ্গিন নেশার স্বপ্ন নিয়ে নাগর খুঁজে পেলাম
কলেজ-পড়া বাবুর ছেলের কথায় গলে গেলাম ।
মধু খেয়ে প্রজাপতি হঠাৎ উড়ান দিল
ঝি-গিরি  কাজের সাথে ইজ্জতটাও গেল ।
সভ্য সমাজের চোখে কুলটা হয়েছি
সাহস করে জারজ শিশুর জন্ম দিয়েছি ।
“সত্যি বলছি আমি সত্যি বলছি” ।।

কালের চাকা ঘুরে গেছে, স্বপ্ন গেছে চুকে
দুখের বোঝা বয়ে বয়ে কাঁধ গিয়েছে ঝুঁকে ।
আসেনি কেউ হাত বাড়িয়ে মুছতে চোখের জল
জীবন যে তাই শিখিয়েছে একলা রে তুই চল ।
বাঁচতে গেলে লড়তে হবে বুঝতে পেরেছি
আজ লড়াই করে বেঁচে থাকা শিখে গিয়েছি ।
“সত্যি বলছি আমি সত্যি বলছি” ।।

সেলাই করে, ঠোঙ্গা বেঁধে রাত করেছি পার
কুমারী মায়ের ছেলেটা আজ আই.এ.এস. অফিসার ।
পাঁচ কামরার বিশাল ঘরে আজ আমাদের বাস
দামী গাড়ী, দামী খাবার সুখ যে বারোমাস ।                       হার মানিনি, জীবন-যুদ্ধে জিতে গিয়েছি                          আজ হাতের মুঠোয় স্বপ্নটাকে ধরে ফেলেছি ।
“সত্যি বলছি আমি সত্যি বলছি” ।।